সিংহপুরীয় জীবনধারা

আগের একটা পোস্ট থেকে কন্টিনিউ করে এই লেখার শুরু,

Days and Nights in this PERFECT City

প্রায় দুই মাস হতে চলল সিঙ্গাপুরে থাকার, এরই মধ্যে নতুন বেশ কিছু জিনিস/অভিজ্ঞতা যেগুলো উল্লেখযোগ্য, সেগুলো লিখে রাখতেই এই পোস্ট। বি.দ্র. নিচের ছবিতে PERFECT কথাটা প্রকৃতভাবে ‘নিখুঁত’ অর্থে লেখা হয়নি। একটা রোবট যেভাবে তার মনিবের কথা মত সব কাজ ‘perfectly’ করে, সিঙ্গাপুরও সেই একইভাবে perfectly চলছে। আসলে, একরকম জোর করেই এই শহরের প্রতিটা জিনিস/মানুষকে নিখুঁত করে রাখা হচ্ছে। এই ব্যাপারটা নেতিবাচক শুনালেও এর মধ্যে ইতিবাচক ফলাফল আছে। আশা করি পরবর্তী পোস্টগুলোতে এই বিষয়টা আরো বিশদ ভাবে লিখতে পারবো।

ঘুম-খাদ্যাভ্যাস

এই প্যারাটা আসলে খাদ্য তালিকা বা মেনু নিয়ে না, বরং এখানের মানুষের প্রতিদিনের খাবারের সময়সূচী নিয়ে। সিঙ্গাপুরে আসার পর থেকেই খেয়াল করি, এখানে লাঞ্চ টাইম শুরু হয় বেলা ১১ টা থেকে এবং দুপুর ১২টা/১২.৩০ এর মধ্যে শেষ। ডিনার এর সময় হল বিকেল ৫ টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা। এমনকি ডিপার্টমেন্টের পেছনের ক্যান্টিনও বন্ধ হয়ে যায় ৭ টার আগেই! পুরো দেশেই সবাই মোটামুটি এই সময় মেনেই খাওয়া দাওয়া করে। রাতের বেলায় খাওয়া দাওয়া করে সাধারনত পশ্চিমা লোক এবং আমাদের মত কিছু অলস জাতি। অলস বলছি এই জন্যে যে পুর্বএশীয়দের ঘুম ভাঙ্গে খুব ভোরে, তারা ব্রেকফাস্ট করে ৭/৮টার দিকে এবং ঘুমাতে যায় রাত ১১/১১.৩০ এর মধ্যে। এই জন্যেই অনেক সময়েই আমরা রাতের দিকে আড্ডা দিতে নিলে ওদের ঘুমে ব্যাঘাত হয় বলে আড্ডা বন্ধ করতে হয়েছিল।

ট্রাফিক নিয়ন্ত্রন

জনসংখ্যা ঘনত্বের তালিকায় ২য় স্থানে থাকা দেশ সিঙ্গাপুর। দেশের আয়তন ৭২১.৫ বর্গ কি.মি. এবং জনসংখ্যা প্রায় ৬০ লক্ষ। ঢাকায় প্রায় ১ যুগ বসবাস করার পর মনে হতেই পারে সিঙ্গাপুরেও একই ভাবে ট্রাফিক জ্যাম, ধুলাবালি, অনিয়ম থাকবে। অসাধারন ট্রাফিক ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে এদেশে আসলে ট্রাফিক বিষয়ক কোন ঝামেলাই নাই বলা চলে। এগুলোর জন্য কিছুকিছু পয়েন্ট একেবারে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া যায়। বেশি বর্ণনা না দিয়ে পয়েন্ট করে লিখলেই সুবিধা হবে।

  • চমৎকারভাবে পরিকল্পিত রাস্তাঘাট এবং এম.আর.টি. (Massive Rapid Transport) লাইন। প্রয়োজনমত রাস্তার প্রস্থ দেওয়া, বাস থামার জন্য পকেট বানানো, গুরুত্বপূর্ণ সব জায়গায় এম.আর.টি. লাইন দেওয়া ইত্যাদি।
  • জাতিগতভাবে ট্রাফিক নিয়ম পালন করা। ট্রাফিক নিয়ম অমান্য করা খুবই দুর্লভ ব্যাপার। যানবাহন, পথচারী সবাই ট্রাফিক নিয়ম, লেইন মেনে চলে। শুধু একটা এলাকাই চোখে পরার মত ব্যতিক্রম, লিটল ইন্ডিয়া ও ফেরার পার্ক সংলগ্ন এলাকা; এই এলাকায় আবার বেশির ভাগই উপমহাদেশীয় লোকজন থাকে কিনা!
  • পাবলিক ট্রান্সপোর্ট এর প্রতুলতা। মোটামুটি সব জায়গাতেই যাওয়ার জন্যে পাবলিক বাস/ট্রেন(এম.আর.টি.) আছে। এগুলোর সময় খুব নিয়ন্ত্রিত এবং ফ্রিকোয়েন্সিও যথাযত। কিছু কোম্পানি সরকারি এবং কিছু বেসরকারিভাবে চালানো হয়, তবে সব যানবাহনই সরকারের কঠোর নজরদারিতে থাকে।
  • ধীর গতির যানবাহন না থাকা (যেমন, রিকশা)। মোটামুটি সব রাস্তাতেই (এপার্টমেন্টের ভেতরেরগুলো বাদে) পাবলিক বাসস্টপ থাকে। এইজন্য আসলে রিকশা জাতীয় যানবাহনের দরকারও হয় না। তবে মাঝে মাঝে মনে হয় যেন, ছোট রাস্তাগুলো রিকশা জাতীয় কিছু থাকলে খারাপ হত না!
  • রাস্তা পারাপারের সঠিক সুযোগ। প্রয়োজনমত ফুটওভারব্রিজ এবং জেব্রা ক্রসিং থাকায় রাস্তা পারাপার করতে কাউকেই অহেতুক ঝুঁকি নিতে হয়না।

References

https://en.wikipedia.org/wiki/List_of_countries_and_dependencies_by_population_density

ল্যাব রোটেশনের এই দিনগুলো

অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ওয়াং ওয়েই এর ল্যাবে দিন গুনছি কবে এই জিনিস শেষ হবে, কারন, ছয় সপ্তাহের এই ল্যাব রোটেশনে বিচিত্র নতুন কিছু অভিজ্ঞতার সম্মুখীন আমি যার জন্য এই দিন গোনাগুনি। আগে বলে রাখি, ল্যাব রোটেশন হচ্ছে পিএইচডি রিসার্চ শুরু করার আগে ট্রায়াল বেসিসে দুইটা ভিন্ন ল্যাবে দুইজন ভিন্ন প্রফের অধীনে কাজ করতে হয়। এই দুই ল্যাব প্রথম সেমিস্টারে দুই ভাগে হয়, প্রথম ভাগে প্রথম ছয় সপ্তাহ এক ল্যাবে, পরের ভাগে আরেকটায়। তবে এই দুই ভাগে দুই প্রফের কাছ থেকে ‘স্যাটিসফ্যাকটোরি’ গ্রেড নেয়া লাগে। যাই হোক, ল্যাব রোটেশনের এই ব্যপারটা আমার কাছে বেশ ভালই লেগেছে, কারন আমার মত স্টুডেন্ট যারা দেশে গ্র্যাজুয়েশনের পরে নাকে তেল লাগিয়ে ঘুমিয়ে বেড়িয়েছে, তাদেরকে হঠাৎ করেই পিএইচডি রিসার্চে না বসিয়ে ‘আসল’ পিএইচডি রিসার্চ কি জিনিস সেটার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার খুবই মোক্ষ্ম সুযোগ করে দেই এই ল্যাব রোটেশন। তাছাড়া অনেক স্টুডেন্টেরই ল্যাব রোটেশন করতে গিয়েই সুপারভাইজার ঠিক হয়ে যায়।

এই লেখা শুরু করেছি যখন তখন আমি প্রথম ভাগের পঞ্চম সপ্তাহে প্রফ ওয়াং ওয়েই এর প্রোজেক্টের কাজে যে ল্যাবে বসেছি সেখান থেকে লিখছি। এই ল্যাব রোটেশন থেকে ইতিমধ্যে যেসকম তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় খেয়াল করেছি সেগুলো পয়েন্ট আকারে নিচে দিলাম।

  • চাইনিজ বংশদ্ভুত এই প্রফ ল্যাবে কাজ শুরুর আগেই আমাকে জানিয়ে দেন যে উনার ল্যাবের স্টুডেন্ট/রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টরা সোম-শনি ১০টা(সকাল)-১০টা(রাত) ল্যাবে থাকে। এ কথা শুনেই এই প্রফের সাথে/প্রোজেক্টে কাজ করার আমার যে একটা ক্ষীণ ইচ্ছা ছিল সেটা মুহূর্তেই গায়েব হয়ে যায়।

    আমার ধারনা চীনা পরিবেশে বড় হওয়া লোকগুলো সারাদিন পরিবার, বন্ধু, আড্ডা, গল্প ছেড়ে কর্মক্ষেত্র থেকে সকল কাজ করতেই পছন্দ করে। এই ল্যাবের বাকি সব স্টুডেন্টই চীনা এবং তারা আসলেই এই ১০-১০টা রুটিন ফলো করে। এখানেই এদের দুপুরের খাবার, সান্ধ্যকালীন খাবার এবং আড্ডা সবই হয়। এদের এই ব্যপারটার সাথেই কোনভাবেই খাপ খাওয়াতে পারলাম না এই পাঁচ সপ্তাহে।

  • ল্যাবের স্টুডেন্টরা সবাই চাইনিজ হওয়ায় এরা এরা নিজেরা কি বলে না বলে কিছুই বুঝিনা, মজা করলেও বুঝি না, গালি দিলেও বুঝি না। এই জন্য এদের সাথে এই এক মাসেরও বেশি সময়ে কখনোই কথা বলে বেশি আরাম পাইনি। এটাও একটা কারন যেজন্য আমি এইরকম চাইনিজ-পূর্ণ ল্যাবে কাজ করতে আর ইচ্ছুক না।